প্রচ্ছদ

আজকের শবেবরাতের ফজিলত ও ইবাদত

প্রকাশিত হয়েছে : ৮:২৯:৩১,অপরাহ্ন ০১ মে ২০১৮ | সংবাদটি ৩১৯ বার পঠিত

সিলেট নিউজ ওয়ার্ল্ড ডটকম

পবিত্র শবেবরাত আজ মঙ্গলবার (০১ মে)। মুসলমানদের জন্য সৌভাগ্যের রাত। হিজরি শাবান মাসের ১৪ তারিখের এ রাতকে পবিত্র কোরআনে ‘লাইলাতুল মোবারাকা’ বা বরকতময় রাত অভিহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মুসলমানরা মহান আল্লাহর রহমত ও নৈকট্য লাভের আশায় নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এ রাত অতিবাহিত করবেন। মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে এ রাতে।
পবিত্র মাহে রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে শবেবরাত। ফার্সি ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত, আর ‘বরাত’ শব্দের অর্থ ভাগ্য। হাদিসে বর্ণিত আছে, বিশেষ এ রাতে মহান আল্লাহ আগামী এক বছরের জন্য মানুষের রিজিক, জন্ম-মৃত্যু প্রভৃতি বিষয় নির্ধারণ করেন এবং পুরো জীবজগতের ওপর রহমত নাজিল করেন। এ জন্যই এ রাতকে শবেবরাত বা ভাগ্যরজনী বলা হয়। আজ সূর্যাস্তের পর থেকে বুধবার সূর্যোদয় পর্যন্ত এ রাতের ফজিলত অব্যাহত থাকবে।

শবেবরাত উপলক্ষে বাংলাদেশ ও বিশ্বের মুসলমানদের মোবারকবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-ধর্মীয় সংগঠন বাণী দিয়েছে।শবেবরাতের পবিত্রতা রক্ষায় পটকা ফাটানো, আতশবাজি নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে রাতটি কাটাবেন বাংলাদেশের মুসলমানরা। অনেকেই নফল রোজা রাখবেন। প্রায় সবাই সাধ্যমতো দান-খয়রাত করবেন। রাতব্যাপী এবাদত-বন্দেগি করবেন তাঁরা। মৃত মা-বাবা, আত্মীয়স্বজনদের কবর জিয়ারত করবেন। এ উপলক্ষে সবার ঘরেই হালুয়া-রুটি প্রভৃতি খাবারের আয়োজন করা হয়। আত্মীয়স্বজন ও গরিবদের মাঝে এসব খাবার বিতরণ করা হয়। তবে এসব আয়োজনের কারণে মূল ইবাদতে যেন ব্যাহত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী চিন্তাবিদরা।

শবেবরাত উপলক্ষে আজ মসজিদে মসজিদে বিশেষ মোনাজাত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আজ মাগরিবের পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত বিশেষ এবাদত-বন্দেগির ব্যবস্থা করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে কোরআন তেলাওয়াত, হামদ-নাত, ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ-কিয়াম ও বিশেষ মোনাজাত।

শবেবরাত উপলক্ষে বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘মহিমান্বিত রজনী পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে আমি দেশবাসীসহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে জানাই আমার আন্তরিক মোবারকবাদ।…পবিত্র শবেবরাত সবার জন্য ক্ষমা, বরকত, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ বয়ে আনুক মহান আল্লাহর দরবারে এ কামনা করি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব মুসলমানকে জানাই আমার আন্তরিক মোবারকবাদ।…মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।’

শবেবরাতের ফজিলত ও ইবাদত: মহাদয়ালু আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের ওপর দয়া ও ক্ষমার কেবল অসিলা তালাশ করেন, যেকোনো পথেই হোক ক্ষমা করার বাহানা খোঁজেন। তাই দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর গুনাহগার বান্দাদের ক্ষমা করার জন্য বিভিন্ন স্থান ও সময়-সুযোগ বাতলে দিয়েছেন, যাতে বান্দা নিজ কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়, আর আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেবেন। সেসব সময়ের একটি হলো শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যাকে আমাদের প্রচলিত ভাষায় শবেবরাত বলা হয়। কোরআনে কারিমের ভাষায় একে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাত, আর হাদিস শরিফে এটি ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান’ বলে উল্লেখ রয়েছে।

হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, অর্ধ শাবানের রাতে অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক-বিদ্বেষী লোক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫, আল মু’জামুল কাবীর ২০/১০৯, শুআবুল ইমান, হা. ৬৬২৮)।

অষ্টম শতাব্দীর যুগশ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামি (রহ.) বলেন, হাদিসটির সূত্রের সব বর্ণনাকারী ‘নির্ভরযোগ্য’। (মাজমাউজ জাওয়াইদ ৮/৬৫)। এছাড়া এ মর্মে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), আলী ইবনে আবি তালিব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.), আবু মুসা আশআরি (রা.), আবু হুরাইরা (রা.), আয়েশা (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকেও হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন, এতে এত দীর্ঘ সময় ধরে সিজদা করলেন যে আমার ভয় হলো তিনি মারাই গেছেন কি না। এ চিন্তা করে আমি বিছানা থেকে উঠে রাসুল (সা.)-এর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিই, এতে আমার বিশ্বাস হলো তিনি জীবিত আছেন। তারপর নিজ বিছানায় ফিরে এলাম। এরপর তিনি সিজদা থেকে মাথা ওঠালেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি ধারণা হয়েছে যে নবী তোমার সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করেছে? আমি বলি, জি না, হে আল্লাহর রাসুল! তবে আপনার দীর্ঘ সময় ধরে সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন।

এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজকের এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এ বিষয়ে অধিক জ্ঞাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এ রাতটি অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের দয়া করেন। তবে হিংসুক লোকদের তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন। (শুআবুল ইমান, হা. ৩৮৩৫)। যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম বায়হাকি (রহ.) বলেন, এটি উত্তম মুরসাল হাদিস। (শুআবুল ইমান ৩/৩৮৩)।

শবেবরাতে রাত জেগে ইবাদত করা ও পরদিন রোজা রাখা: হজরত আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘১৫ শাবানের রাত যখন হয়, তোমরা রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে পালন করো এবং দিনের বেলা রোজা রাখো। কেননা এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে এসে বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কোনো রিজিক অন্বেষণকারী আছে কি? আমি তাকে রিজিক প্রদান করব। আছে কি কোনো রোগাক্রান্ত? আমি তাকে আরোগ্য দান করব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে তাদের ডাকতে থাকেন। ‘ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ১৩৮৮)।

হাদিস বিশারদগণের গবেষণা মতে, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। তবে এতে শুধু ইবনে আবি সাবরা নামের এক ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে হাদিসটি সামান্য দুর্বল বলে গণ্য হবে। আর এ ধরনের দুর্বল হাদিস ফাজায়েলের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া শবেবরাত সম্পর্কীয় হাদিসগুলোকে যুগশ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ ইমামগণ সমষ্টিগতভাবে ‘সহিহ’ বা বিশুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন, যাঁদের মধ্যে ইমাম ইবনে হিব্বান, হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলি, হাফেজ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

বছরব্যাপী ভাগ্যনির্ধারণের রজনী শবেবরাত: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এই রাতে হেকমতপূর্ণ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত করা হয়। ‘ (সুরা দুখান, আয়াত ২-৩) কোরআনের ব্যাখ্যাকারদের অনেকে আয়াতে উল্লিখিত ‘লাইল’ থেকে শবেকদর উদ্দেশ্য বললেও কয়েকজন ব্যাখ্যাকার এর অর্থ শবেবরাত বলেছেন। এ ব্যাপারে ইকরামা (রহ.) সূত্রে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা অর্ধশাবানের রাতে যাবতীয় সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ফয়সালা করেন। আর শবেকদরে তা নির্দিষ্ট দায়িত্বশীলদের অর্পণ করেন। (তাফসিরে কুরতুবি ১৬/১২৬)।

হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, অর্ধশাবানের রাতের কার্যক্রম হলো, এ বছর যারা জন্মগ্রহণ করবে এবং যারা মারা যাবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতেই মানুষের আমল পৌঁছানো হয়। এতেই তাদের রিজিকের বাজেট করা হয়। (ফাজায়েলে আওক্বাত, বায়হাকি, হা. ২৬)।

তাই এ রাতে তসবিহ-তাহলিল, ইসতিগফার, কোরআন তেলাওয়াত বেশি বেশি করতে হবে। কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে হবে। এ ছাড়া উমরি কাজা ও নফল নামাজ অধিক পরিমাণে পড়তে হবে। তবে শবেবরাতের নির্দিষ্ট কোনো নামাজ নেই। হাজারিকা নামাজ বলতে ইসলামে কিছু নেই। এটি বেদআত। এ রাতে কবর জিয়ারতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। আল্লাহ আমাদের নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Media it

দেশ-বিদেশের পাঠক

আর্কাইভ

সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০