প্রচ্ছদ

শহীদুল জহির ও গভীরভাবে অচল মানুষের ভার

www.sylhetnewsworld.com

আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;

 

আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছবার সময় আছে,

 

পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।

 

জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা

 

অন্য সবাই বহন করে করুক, আমি প্রয়োজনবোধ করি না।

 

আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ

 

হয়ত এই নবীন শতাব্দীতে

 

নক্ষত্রের নীচে।’

 

[উনিশশো চৌত্রিশের- জীবনানন্দ দাশ]

 

সম্পদ ও সাফল্যের পেছনে মানুষ আদিকাল থেকেই ছুটছে আর বর্তমানে এটা ছাড়া তার জয়যাত্রা অসম্পূর্ণ। আশা ও হতাশার কথা, ১ শতাংশ মানুষ তাদের জয়যাত্রা পূর্ণ করতে পারলেও ৯৯ ভাগেরই কপালে শিঁকে আর ছিঁড়ছে না। হালে পণ্য উৎপাদন, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, বিবিএ-এমবিএ, সিইও, প্রফিট, হাই স্যালারি, বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বাজেট- এসব খুব উচ্চারিত অভিধা। মানুষ এসব অ্যাচিভ করতে হরদম দৌড়াচ্ছে। দৌড়াচ্ছে ভোর থেকে রাত, পাহাড় থেকে পাতাল, প্যারিস থেকে দুবাই। সম্ভবত মানুষের এ প্রবণতা সহজাত বলে প্রফিট ও সারপ্লাস ভ্যালুর ইঁদুর দৌড়ের এ বেমক্কা চক্কর শেষ হচ্ছে না। গল্পকার শহীদুল জহির এই দৌড়কে অস্বীকার করেন নাই, বোঝার চেষ্টা করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, মানুষ এই দৌড়ের মধ্যে আরামে নাই। তাঁর কয়েকটি গল্পে দেখি এর মূল চরিত্ররা এই দৌড়ে সামিল নয়, তারা যেন একটা ম্যারাথন রেসের পাশে দাঁড়িয়ে দৌড়ের উপর থাকা সারি সারি মানুষের পার হয়ে যাওয়া দেখছে। তারা নক্ষত্রের নিচে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা এ পৃথিবীর একটা ভীষণ অচল, অকেজো মানুষ।

 

শহীদুল জহির (১৯৫৩-২০০৮) খুব বেশি গল্প লেখেন নাই ‘পারাপার’ (১৯৮৫) গ্রন্থে ৫টি, ‘ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প’ (১৯৯৯)-তে ৮টি এবং ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’ (২০০৪)-এ ৬টি (মোট ৭টি গল্প, ১টি পুনঃপ্রকাশিত), ‘শহীদুল জহির সমগ্রে’ (পাঠক সমাবেশ) অপ্রকাশিত ৪টি গল্প রয়েছে। কিন্তু সামান্য কয়েকটি গল্প দিয়েই তিনি নিজের জাত চিনিয়েছেন, অনুসন্ধিৎসু ও মননশীল পাঠকের কাছে একজন বিস্ময়কর লেখক হিসেবে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছেন।

 

নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও এর নানামাত্রিক পর্ব ও পর্যায়, মুক্তিযুদ্ধ ও তার প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনের বিপর্যস্ততা, সমাজে পচাগলা রাজনীতির কর্কশ কামড়, পুরান ঢাকার কোলাহলময় ও যৌথ জনসংস্কৃতি, মৌলবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উত্থান ও তৎপরতা, হিন্দু নিপীড়ন, ভূমিহীন কৃষক ও দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবন,…আর যাদুবাস্তবতা- মোটা দাগে এসবই শহীদুল জহিরের গল্পের বিষয়বস্তু হয়ে ঘুরেফিরে আসে। এর বাইরেও তাঁর গল্পে নানা স্বর ও স্বাদ লেগে থাকে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়।

 

‘পারাপার’-এর গল্পগুলো ১৯৭৪-৭৬ সালে লেখা যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বইটি ছাপা হয় তাঁর পূর্বনাম শহীদুল হক নামে। এ নামে তখন আরো দুজন লেখক জীবিত থাকায় নিজের ‘হক’টাকে বিসর্জন দিয়ে তিনি দাদার কাছ থেকে জহির ধার করলেন। ঢাকা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, মার্ক্স-মাওয়ের লাল মোড়কের রঙিন বই ও সাদাকালো দার্শনিক চেতনা তাকে প্রভাবিত করে। আবার সংঘের যোগ্য লোক মনে না হওয়ায় তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। কিন্তু সংস্কৃতি, সমাজ ও মানুষকে দেখার ও বোঝার যে কায়দা-কৌশল তিনি রপ্ত করেছিলেন সেটা ছিল মননশীল সমাজবিজ্ঞানীর মতো এবং পরবর্তীতে তা নানা লেখায় প্রভাব রেখেছিল।