‘আমি আমার ছবিতে আত্মাকে লালন করি’ - Sylhetnewsworld.com
প্রচ্ছদ

‘আমি আমার ছবিতে আত্মাকে লালন করি’

www.sylhetnewsworld.com

অনেকে আকাশ ছুঁতে চান, অনেকে মাটির আরো কাছে থাকতে চান। কেউ খ্যাতির চূড়ায় উঠতে গিয়ে হোঁচট খান, কেউ আবার জনশূন্য খ্যাতির চূড়ায় ওঠার কথা ভাবতেই পারেন না। কারণ মানুষ যত উপরে ওঠে, সে ততো একা হয়ে পড়ে। যদিও প্রতিটি মানুষের আলাদা স্বকীয়তা রয়েছে। শিল্পী অলকেশ ঘোষ মাটির আরো কাছাকাছি থাকতে চান। তিনি নিভৃতে আত্মমগ্ন হতে চান চিত্রশিল্প জগতে। দীর্ঘ চার দশক তিনি ছবি আঁকছেন। সম্প্রতি কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন শিল্পকলা পদক-২০১৮। তার জীবনের সবকিছুই যেন আবর্তিত হয় ছবি আঁকাকে কেন্দ্র করে। নিরবচ্ছিন্নভাবে এঁকে যাওয়া আত্মমগ্ন শিল্পী অলকেশ ঘোষের মুখোমুখি হয়েছেন ঢাবি চারুকলার শিক্ষক, চিত্রশিল্পী কামালুদ্দিন।

 

কামালুদ্দিন: আপনি সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে শিল্পকলা পুরস্কার পেয়েছেন- কেমন লাগছে?

 

অলকেশ ঘোষ: একটু তো ভালো লাগছেই!

 

কামালুদ্দিন: আপনার কি মনে হয়- শিল্পীদের পুরস্কার পেতেই হবে? না হলে শিল্পী হওয়া যাবে না?

 

অলকেশ ঘোষ: পুরস্কারের সঙ্গে শিল্পী হওয়ার বা শিল্পীর কোনো সম্পর্ক নেই। পুরস্কার হলো কাজের স্বীকৃতি। যেমন আমি  পুরস্কার পেয়েছি, মানুষ এখন ভাববে- আমি কত বড় শিল্পী! এমনিতে মানুষ কত কথা বলে- অলকেশ জীবনে ছবি এঁকে কী করলো! এখন অন্তত তাদের মুখ বন্ধ হলো- এই আর কি!

 

কামালুদ্দিন: আপনি পুরস্কারের সংবাদটি প্রথম কীভাবে জানলেন?

 

অলকেশ ঘোষ: আমার কাছে এমনিতেই শিল্পকলা থেকে সব ধরনের অনুষ্ঠানের চিঠি আসে। আমি ওসব খুলি না, একপাশে রেখে দিই। একদিন দেখলাম বড় একটা খাম দিয়ে গেলো শিল্পকলা থেকে; তাও আমি নিচে ফেলে রেখেছিলাম। হঠাৎ কেনো জানি এক বিকেলে ঐ বড় খামের দিকে তাকিয়ে মনে হলো- এত বড় খাম দিলো কেন? খামটি খুললাম। দেখি আমাকে শিল্পকলা পদকের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। এমন একটি চিঠির সঙ্গে গত বছরের একটা নমুনা ব্রুশিয়ার এবং আমি যেনো ব্রুশিয়ার ফলো করে পোর্টফলিও পাঠিয়ে দিই শিল্পকলাতে- এসব চিঠিতে লেখা ছিল। তৎক্ষণাৎ আমি সমরজিত স্যারকে ফোন করে খবরটা জানাই।

 

কামালুদ্দিন: আপনার কি মনে হয় পুরস্কার পাওয়ার পর দেশের প্রতি দায়িত্ব আরো বেড়ে গেলো?

 

অলকেশ ঘোষ: এসব আমি বুঝি না! আমি শিল্পী, আমার কাজ ছবি আঁকা। মানুষ নিজ নিজ পেশায় দায়িত্বের সঙ্গে কাজটি করলেই সেটা দেশের জন্য করা।

 

কামালুদ্দিন: আপনাকে ছবি আঁকার এই জগত কে দেখিয়েছে? অর্থাৎ আপনার শুরুটা কীভাবে হলো জানতে চাইছি।

 

অলকেশ ঘোষ: আমি জামালপুর গভঃ হাই স্কুলে পড়ার সময় স্কুলে রবিদত্ত স্যারকে পেয়েছিলাম। তিনি আমাদের স্কুলের আর্ট টিচার; অসাধারণ ছবি আঁকতেন। বিশেষ করে পোর্ট্রেট কীভাবে যাদুর মতো এঁকে ফেলতেন ভাবা যায় না। আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতাম আর স্বপ্ন দেখতাম- আমি স্যারের মতো ছবি আঁকবো। তখন আমিও শুরু করে দিলাম। স্যার আমাকে বলতেন, পোর্ট্রেট শিখো, তাতে কিছু রোজগার হবে। পরিবারেও আমার সাংস্কৃতিক আবহ ছিল। বাবা সেতার বাজাতেন। ফলে ছবি আঁকায় আমার কোনো বাধা থাকল না। বাবা- মা, দুই ভাই, দুই বোন সবাই আমাকে উৎসাহ দিয়েছে।

 

কামালুদ্দিন: আপনি কিসের ছবি আঁকেন?

 

অলকেশ ঘোষ: আমি আমার আত্মাকে আঁকি। আমার দেশের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি সবই আমার আত্মা। ঐ আত্মাকে লালন পালন করি আমার ছবিতে।

 

কামালুদ্দিন: তার মানে আপনি সুখী মানুষ। দারুণ সব ছবি আঁকতে পারছেন- তাই তো?

 

অলকেশ ঘোষ: আমি অনেক সুখী। কারণ আমি প্রতিদিন ছবি আঁকতে পারি- এর চেয়ে আর বেশি কোথায় সুখ আছে জানি না। ছবি আঁকা আমাকে সুখী করে। জীবনে দুঃখ কষ্ট থাকবেই। আমি শিল্পী, ছবি আঁকা ছাড়া আমি আর কিছু ভাবতে পারি না।

 

কামালুদ্দিন: আপনার কি মনে হয় চারুকলায় পড়লেই সৃষ্টিশীল বা শিল্পী হওয়া সম্ভব?

 

অলকেশ ঘোষ: শোনো, আবেদিন স্যার একটি কথা বলেছিল- ‘চর্চা সৃষ্টিশীলতার জন্ম দেয়’। ছাত্রছাত্রীদের মাথায় যদি আগেই জটিল চিন্তা ঢুকে যায় তারা কীভাবে শিল্পী হবে? বলে কয়ে কি শিল্পকর্ম হয়? ধরো, এখন কেউ যদি এসে বলে, আমি শিল্পী হতে এসেছি। তাকে দিয়ে কিছু হবে না। শিল্প সাধনার ব্যাপার। সাধকরা কখন কী হয় বলা যায় না।

 

কামালুদ্দিন: জয়নুল আবেদিন স্যারের সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছে?

 

অলকেশ ঘোষ: তার ছোট ভাই জনাবুল আবেদিনের মাধ্যমে আবেদিন স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম, অনেক জলরঙ নিয়ে। স্যার ছবি দেখে খুবি উৎসাহ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আরো বেশি কাজ করার জন্য।

 

কামালুদ্দিন: আপনার ছাত্রজীবনের দু’জন শিক্ষকের নাম বলুন।

 

অলকেশ ঘোষ: নবী স্যার, মনির স্যার। মূলত এই দুজনের কাছ থেকে জলরঙ শিখেছি। জানি না, নবী স্যার এখন আর দেখায় কিনা। দুজনই অসাধারণ জলরঙ করতেন।

 

কামালুদ্দিন: আপনিও তো জলরঙে সিদ্ধহস্ত। আপনার কার আঁকা জলরঙ বেশি ভালো লাগে?

 

অলকেশ ঘোষ: আবেদিন স্যারের, নবী স্যারের, মনির স্যারের, গোপাল ঘোষের আর শ্যামল দত্ত রায়ের, পরেশ মাইতির কাজও ভালো লাগে।

 

কামালুদ্দিন: জলরঙ নিয়ে কিছু বলুন?

 

অলকেশ ঘোষ: জলরঙ হলো কবিতার মতো- অল্প কথায় অল্প স্বাদ। আর জলরঙ শিখতে গেলে জল আর রঙের পরিমাপ বুঝতে